Connect with us

Recent Analysis

সমূদ্র অর্থনীতি: বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য আর্শিবাদ

সব যুগেই সমুদ্র ছিলো একটি বিস্ময়ের নাম। প্রাচীনকাল থেকে এই সমুদ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানান মিথ। সমুদ্রপথে নাবিকেরা ভ্রমণ করেছে এক দেশদেশান্তরে। আজও মানুষ ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানা কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাগরের বুকে। পৃথবীতে প্রাণ ধারণের উপযোগী ৯৭ শতাংশ জায়গাই সমুদ্রে। ফলে সমুদ্র প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর। ডড়ৎষফ জবমরংঃবৎ ঙভ গধৎরহব ঝঢ়বপরবং-এর মতে, সাগরের প্রাণবৈচিত্র্যের তিন-চতুর্থাংশ সম্পর্কে মানুষের তেমন জানাশোনাই নেই। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে সমুদ্রের কাছে ছুটে গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় একবিংশ শতকে সমুদ্র মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার। আর তা হলো ইষঁব ঊপড়হড়সু (নীল অর্থনীতি) বা সমুদ্র অর্থনীতি।

সমুদ্র অর্থনীতি কি?
পৃথিবী নামক যে গ্রহটিতে আমাদের বসবাস তার এক ভাগ মাটি, তিন ভাগ পানি। পানিসমৃদ্ধ সেই বিশাল অংশটিকে আমরা বলি সমুদ্র। আর এই সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতিই হলো সমুদ্র অর্থনীতি ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ইষঁব ঊপড়হড়সু। সমুদ্র ভিত্তিক খাদ্য, জ্বালানি, ব্যবসা, বিনোদন সবকিছুই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সমুদ্রকে ঘিরে এই সম্ভাবনার কথা প্রথম যিনি বলেন তিনি হলে রুপকার ম‚লত একজন বেলজিয়ান উদ্যোক্তা, লেখক, গবেষক এঁহঃবৎ চধঁষর যাকে ডাকা হয় “ঞযব ঝঃবাব ঔড়নং ড়ভ ঝঁংঃধরহরনরষরঃু” নামে। তিনিই সর্বপ্রথম ব্লু ইকোনোমির বিষয়টি আমাদের সামনে তুলে ধরেন। ২০১০ সালে গুন্টার পাওলি তার “ঞযব ইষঁব ঊপড়হড়সু: ১০ ুবধৎং –১০০ রহহড়াধঃরড়হং – ১০০ সরষষরড়হ লড়নং” শীর্ষক বইয়ে সম্ভাবনাময় সমুদ্র অর্থনীতির রূপরেখা এবং সেটির টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব একটি মডেল প্রদান করেন যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত ও অনুদিত হয়।

সমুদ্র অর্থনীতি কেন গুরুত্বপ‚র্ণ?
১। সমুদ্র হলো মৎসসম্পদ, তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদের ভাÐার। বিশ্বের প্রায় ৪৫০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের যোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্নগ্যাস ও তেল ক্ষেত্রে থেকে।

২। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবার যোগান দিতে তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে।

৩। পৃথিবীর মোট বাণিজ্যিক পরিবহনের ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। এতেই বোঝা যায় বিশ্ব বাণিজ্য কতটুকু সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল।

৪। প্রতিবছর ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাÐ সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে।

৫। জীববৈচিত্র্যের বিপুল খাদ্যভাÐার এ বিশাল সমুদ্র। সমুদ্র পৃথিবীর প্রায় ৭২ শতাংশ অঞ্চল দখল করে আছে এবং এটি জীবমÐলের ৯৫ শতাংশের উৎস। তাই সারা পৃথিবী ব্যাপী বর্তমানে ব্লু ইকোনমির ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু হয়েছে।

৬। ২০১৫ সালের পর থেকে জাতিসংঘ যে টেকসই উন্নয়ন কর্মস‚চি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, তার ম‚ল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ইষঁব ঊপড়হড়সু বা সমুদ্র অর্থনীতি।

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিকে সমুদ্র অর্থনীতি নানাভাবে অবদান রেখে চলেছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জ্ঞান ও গবেষণা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্রনির্ভর ওষুধ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ মুলত সমুদ্রনির্ভর। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা:
সমুদ্র অর্থনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্বপ‚র্ণ অংশীদারিত্বের কারণ হলো বঙ্গোপসাগর।এটি বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর যার আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার। স¤প্রতি মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র (ঞবৎৎরঃড়ৎরধষ ঝবধ), ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপক‚ল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ঈড়হঃরহবহঃধষ ঝযবষভ-এর উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

সমুদ্র অর্থনীতি ও বাংলাদেশ:
সমুদ্র অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য যেসব কারণে গুরুত্বপ‚র্ণ তার মধ্যে তেল ও গ্যাস, মৎস্য, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্প, সমুদ্র পরিবহন ও পর্যটন, লবণ আহরণ ইত্যাদি। গবেষণা মতে, বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন ব্লকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের খনি থাকতে পারে যা আগামি কয়েকশ’ বছরের জ্বালানি চাহিদা প‚রণ করতে সক্ষম। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে ৪৩৫ জাতের ম‚ল্যবান ও পুষ্টিকর মাছ রয়েছে, বিদেশে যার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মৎস্য সম্পদ বিভাগের বিবৃতি অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রতিবছর ৮০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে মাত্র ৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ আমাদের দেশের জেলেরা ধরে থাকেন। বাকি মাছ ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভারতীয় জেলেরা। ফলে বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্য সম্পদের ১ শতাংশও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছেন না উন্নত ধরনের জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে। বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপ‚র্ণ খাত হচ্ছে পর্যটনশিল্প। ডড়ৎষফ ঞৎধাবষ অহফ ঞড়ঁৎরংস ঈড়ঁহপরষ-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সালে পর্যটন খাতে জিডিপির অবদান ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। বৈচিত্র্যপ‚র্ণ প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকায় বাংলাদেশে এ শিল্প বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বাংলাদেশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। এছাড়া পতেঙ্গা, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কুয়াকাটায় প্রতিবছরের নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ পর্যটক আসে।

সরকারের উদ্যোগ:
সমুদ্র অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের সমুদ্র অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে নানা ধরনের কৌশল হাতে নিচ্ছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র অঞ্চল থাকলেও এটি নিয়ে তেমন কোন পরিকল্পনা এর আগে ছিলোনা। তবে স¤প্রতি ঐতিহাসিক সমুদ্র বিজয়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভ‚খÐের চেয়েও বৃহৎ এই জলসীমায় কি পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, খনিজ সম্পদ, নৌ চলাচলসহ অন্যান্য কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে ১৯টি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু ইকোনোমির ধারণা নিয়ে প্রথম বৃহৎ কর্মশালাটিও বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে সরকার বেশ তৎপর। ইতিমধ্যে অনুসন্ধানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ঈড়হড়পড়চযরষষরঢ়ং, ভারতীয় কোম্পানি ঙঘএঈরহফরধ ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানিকে আলাদা আলাদা ব্লকের ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের ইজারা পাওয়া ঈড়হড়পড়চযরষষরঢ়ং স¤প্রতি সরকারকে জানিয়েছে, সেখানে সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস রয়েছে যা বাংলাদেশের ১০ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারবে। বঙ্গোপসাগরের খনিজসম্পদ উত্তোলনে আমাদের প্রযুক্তিগত সামর্থ্যের অভাব রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ। তাই সমুদ্র অর্থনীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপ‚র্ণ হাতিয়ার হতে পারে। যেহেতু সমুদ্রসম্পদ উত্তোলনে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই তাই এতদ্বসংক্রান্ত যেকোন চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারকে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সুযোগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

শিক্ষার্থী
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
৪৩-তম ব্যাচ।

 

তথ্যস‚ত্র:

www.gunterpauli.com

www.marinespecies.org

www.wikipedia.org

www.sciencedirect.com

www.thecommonwealth.org

www.oceanhealthindex.org

www.ittefaq.com.bd

www.banglatribune.com

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *